বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৫-০৩-২৮ ২৩:১৯:০৮
অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস
‘৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর কেউ না কেউ তো প্রধান উপদেষ্টা হতেন। কল্পনা করুন, ড. ইউনূস ছাড়া অন্য কেউ প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন। তাহলে সেই প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্ব কি বিদেশি চাপ, দেশি চাপ আর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ নিতে পারতেন? অন্য দেশের কথা বাদ দেন। ভারতের চাপই নিতে পারতেন না।
অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে যারা সমালোচনায় মুখর থাকেন, তাদের একহাত নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন।
শুক্রবার (২৮ মার্চ) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে দেয়া স্ট্যাটাসে তিনি এসব কথা লিখেছেন।
দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর কেউ না কেউ তো প্রধান উপদেষ্টা হতেন। কল্পনা করুন, ড. ইউনূস ছাড়া অন্য কেউ প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন। তাহলে সেই প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্ব কি বিদেশি চাপ, দেশি চাপ আর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ নিতে পারতেন? অন্য দেশের কথা বাদ দেন। ভারতের চাপই নিতে পারতেন না। বিএনপি এখন নির্বাচন নির্বাচন করে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে ফেলছে। বিএনপি কি সেই চাপ নিতে পারবে? পারবে না যে এটা তারা ভালো করেই জানে। আর জানে বলেই তারা নিজেদের অবস্থানকে নতুন করে ক্যালিব্রেট করছে। টের পাচ্ছেন সেটা? কাদেরকে খুশি করার জন্য?’
তিনি আরো লিখেছেন, ‘‘অনেক আগে ২০১৫ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে এক কনফারেন্সে একজন সাংবাদিক ড. ইউনুসকে প্রশ্ন করেন- ‘আপনি এমন এক বয়সে পৌঁছেছেন, যখন অনেক মানুষ অবসর গ্রহণ করে। কিন্তু আপনি এখনো ব্যস্ত একজন মানুষ। যদিও আপনি আর গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনা করেন না, তবু আপনি ইউনূস সেন্টারের চেয়ারম্যান, যা বিশ্ব সমস্যার সমাধানে নিবেদিত ব্যবসাকে উৎসাহিত করে। এছাড়াও, আপনি বিভিন্ন প্যানেল আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন’। ড. মোহাম্মদ ইউনূস তখন উত্তর দেন- ‘অবসর শব্দটিকেই অবসরে পাঠানো উচিত। কারণ অবসর শব্দটি খুবই ক্ষতিকর। অবসরে যাওয়া মানে বোঝায় যে, আপনার আর কোনো প্রয়োজন নেই, আপনার কাজ শেষ। একটি জাহাজ যখন আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না, তখন সেটিকে অবসরে পাঠানো হয়, অপ্রয়োজনীয় হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু একজন মানুষ কোনো যন্ত্র নয়, যাকে অকেজো করে রেখে দেওয়া যাবে’।’’
‘ড. ইউনূস আরো বলেন- জীবনের প্রথম ধাপে আমরা বড় হই, পড়াশোনা করি, বিয়ে করি, সন্তান লালন-পালন করি, কাজ করি এবং দায়িত্বের চাপে থাকি। সব সময় দায়িত্ব পালন করতে হয়, সব সময় একটা চাপ অনুভব করতে হয়। কিন্তু জীবনের এই দ্বিতীয় ধাপে, প্রথমবারের মতো আমি মুক্ত। আমি যা চাই, তাই করতে পারি। আমার স্বপ্ন ও ইচ্ছাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি। আমি এখন কেবল সেই কাজগুলো করি যা আমি উপভোগ করি।’
ড. ইউনূসের অবসর প্রসঙ্গে ড. মামুন আরো লিখেছেন, ‘ড. ইউনূস উপরের কথাগুলো বলেছিলেন আজ থেকে ১০ বছর আগে। ১০ বছর পর আজকে তার বয়স ৮৩ বছর। ৮৩ বছরের একজন মানুষ ৫৩ বছরের প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষ। ঘরে একজন স্ত্রী যিনি শয্যাশায়ী। শুনেছি তার দেখাশোনাও ড. ইউনূস করেন। বর্তমানে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ সফরে চীনে আছেন। কী সাংঘাতিক ব্যস্ত সময় পার করছেন কল্পনাও করতে পারবেন না। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি চাপ সামলাচ্ছেন ৮৩ বছরের এই মানুষটি। যিনি কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন এই বয়সেও অবসরকে অবসরে পাঠানো যায়।’
উপদেষ্টা নিয়োগ বিষয়ে লিখেছেন, ‘ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হয়ে যেই মানুষদের নিয়োগ দিয়েছেন, তাদের সবাই যোগ্য। ড. ইউনুস প্রধান উপদেষ্টা না হলে ড. আহসান এইচ মনসুরের মতো একজন বিচক্ষণ গভর্নর কি পেতো বাংলাদেশ? এর আগের সরকার কাদের গভর্নর বানিয়েছিল একটু খোঁজ নেন। কী যোগ্যতা ছিলো তাদের? গভর্নরদের র্যাঙ্কিংয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম ডি গ্রেডের গভর্নর ছিলেন আব্দুর রউফ তালুকদার। অথচ শ্রীলঙ্কার গভর্নর নন্দলালের গ্রেড হলো এ মাইনাস, আর ভারতের গভর্নরের গ্রেড হলো এ প্লাস! এসব ইনডেক্স ম্যাটার্স!’
উপদেষ্টাদের বিষয়ে তিনি আরো লেখেন, ‘এই সরকারের একজন উপদেষ্টা আছেন, যার নাম মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক দুটো পরীক্ষাতেই কুমিল্লা বোর্ড থেকে সেরা ১০ এর মধ্যে থেকে মানে বোর্ড স্ট্যান্ড করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে অনার্স-মাস্টার্স দুটোতেই প্রথম হয়ে শেষ করেন। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুরে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি চাইলেই আমেরিকায় লাক্সারি জীবন পার করতে পারতেন, চাইলেই সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে তার শিক্ষকতা পেশা কন্টিনিউ করে লাক্সারি জীবন পার করতে পারতেন। কিন্ত তিনি লাক্সারি জীবন ত্যাগ করে দেশে এসেছিলেন দেশের জন্য কিছু করার জন্য এবং করে যাচ্ছেন। একটা সাদামাটা জীবন যাপন করছেন।’
তবে বর্তমানে ক্ষমতা নিয়ে মানুষের ধারণার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘তাহলে ৫ আগস্টের পরপরই ধর্মান্ধ একটি দল কীভাবে ক্ষমতার কাছাকাছি এলো। কীভাবে জনমনে একটা পার্সেপশন তৈরি হলো যে জামায়াত এবং কিছুটা বিএনপি এখন ক্ষমতায়। এর উত্তর পেতে হলে ৫ আগস্টের পরপরই সেনাপ্রধান কার নাম প্রথমে নিয়েছিলেন, কাদেরকে প্রথমে ডেকেছিলেন, তার উত্তর খুঁজলেই ওপরের প্রশ্নের উত্তর পাবেন। অনেক সেক্টরের বড় বড় নিয়োগ হয়েছে সেই আলোকেই। দেশের সেন্টার অফ পাওয়ার তো দুই জায়গায় ছিলো এবং এখনো আছে। সমস্যা এইখানে। এই কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট যতোদিন থাকবে, দেশ কাঙ্ক্ষিতভাবে চলবে না। তার ওপর তো আছে দেশি বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র ও চাপ।’
ধর্ম ও রাজনীতির বিষয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এটা তো নিশ্চিত, রাজনীতিতে ধর্ম ঢুকলে সেই দেশ কোনোদিন উন্নত হতে পারে না। বর্তমান বিশ্ব ডাটা ড্রিভেন বিশ্ব। ডাটা ও তথ্য উপাত্ত দেখেন। সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানসহ আরও যেই দেশগুলো এমন আছে, তারা কি ভালো আছে? অন্যদিকে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবের দিকে তাকান। তারা যতবেশি লিবারেল হচ্ছে, ততবেশি উন্নত হচ্ছে। এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর নেগোশিয়েশন করতে পরাশক্তিরা সৌদি আরবে যায়, প্যালেস্টাইন-ইসরাইল যুদ্ধ বিরতিতে কাতার বড় ভূমিকা পালন করে।’
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জাতির চরম ক্রান্তি লগ্নে, চারিদিকে যখন ঘোর অন্ধকার, তখন আলো হাতে এগিয়ে এলেন ড. ইউনূস। অন্য খেলোয়াড়রা চেষ্টা করে যাচ্ছেন উনাকে ডিসক্রেডিটেড করতে, উনাকে ব্যর্থ করতে। বাংলাদেশে গত ৪০ বছরে এতো আলোকিত মানুষ ক্ষমতার শীর্ষে যেতে পেরেছিলো? যেখানেই যাচ্ছেন, কী পরিমাণ সম্মান পাচ্ছেন। ৮৩ বছর বয়সেও ক্লান্তিহীনভাবে অনবরত মিটিং, বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। আর দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অসংখ্য মানুষ ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। উনার সফলতা দেখলে তাদের শরীরে ফোসকা পড়ে। কেনরে? উনি সফল হলে যে দেশ সফল, এটা বোঝেন না? কিন্তু আপনাদের কাছে তো দেশের চেয়ে দল আর দলের চেয়ে নিজের স্বার্থ বড়। উনিই এখন অনেকের স্বার্থের বড় প্রতিবন্ধক। তাই উনাকে সরাতেই হবে। উনি সফল হলে তাদের রাজনীতিই বন্ধ হয়ে যাবে।’
ড. ইউনূসের চীন সফর প্রসঙ্গে তিনি আরো লিখেছেন, ‘শুধু চীন সফরেই ইউনূসের সাফল্যের কথা শুনবেন। তাহলে সামান্য একটু বলি, শুনুন। ১৫ হাজার কোটি টাকার বিশ্বমানের মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠা, ১২ হাজার কোটি টাকার চারটি মহাসাগরীয় বাণিজ্য জাহাজ ক্রয়, ১০ হাজার কোটি টাকার তিস্তা ব্যারেজ তৈরি, বিনা শুল্কে ২০২৮ সাল পর্যন্ত মুক্ত পণ্য বাণিজ্যসহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির ১ ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তি হতে যাচ্ছে। এখানেই শেষ না। সম্প্রতি উনার তৎপরতায় জাতিসংঘে রোহিঙ্গা প্রস্তাব পাস হয়েছে ১৪০ দেশের প্রত্যক্ষ ভোটে। যেখানে কোনো দেশ বিপক্ষে ভোট দেয়নি। রোহিঙ্গাদের আগে যেখানে খাবার বাবদ মাসিক সাত ডলার তথা ৮৪৭ টাকা দেওয়া হতো, সেখানে নতুন বাজেটে সেটি বাড়িয়ে এখন থেকে জনপ্রতি খাবারে ১২ ডলার তথা ১৪৫২ টাকা দেওয়া হবে। আর দেশের অভ্যন্তরে রেমিটেন্স ইনফ্লও বেড়েছে, রপ্তানি বেড়েছে। বাংলাদেশের রিজার্ভ স্থিতিশীল আছে। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ঋণের সুদও পরিশোধ করা হয়েছে।’